চলচ্চিত্র

স্বপ্নের পিনকোড ও ‘জোনাকি’

অভিরূপ সেন

স্বপ্নের পিনকোড ও ‘জোনাকি’

ভোরের স্বপ্নের কী পিনকোড থাকে ? থাকে হয়তো , আবার থাকেও না। কারণ কার্শিয়াং এর পেটে সেঁধিয়ে যায় নিশ্চিন্দিপুর, টালার সাথে গুলিয়ে যায় পাঁচমুড়ো পাহাড়। তবে পিনকোড নেই বলে বা জিপিএস এ ধরা দেয়না বলে সে যে নেই তা তো নয়। দশটা-পাঁচটার আমি ,সোম-মঙ্গল- বুধের  আমি যতটা বাস্তব তাঁর থেকে অধিকতর বাস্তব নয় কী স্বপ্নের আমি? কিন্তু এসবই তো নদীতীরে পড়ে থাকা নুড়ি পাথর অথবা ভোররাতে লোমকূপে জমে থাকা ইন্টারপ্রেটেশন অফ ড্রিম। ঠিক কী হয় যখন অন্ধকার টানেল বেয়ে নেমে আসে গভীর রাতের স্বপ্নেরা , যখন ব্যাঙের রক্ত খেলা করে শরীরের আনাচে কানাচে, যখন লাভক্রাফটের ডিস্টোপিয়ান ফিকশন  ‘ বিওন্ড দ্য  ওয়াল অফ স্লিপ’ এর মতই অশৈলি কাণ্ডকারখানা ঘটে চলে গভীর অবচেতনে? ঘেঁটে যাওয়া টাইম স্পেসের এই অলৌকিক দুনিয়ায় কী যেন খোঁজে কিছু মানুষ । কী খোঁজে তারা? উত্তরহীন আখ্যান হয়ে জ্বলতে নিভতে থাকে  কিছু ‘জোনাকি’।

মিঠুপিসির স্বপ্ন

একটা বোমারু বিমান উড়ে যায়  আকাশ চিরে। একটা বোমারু বিমান উড়ে গিয়েছিল  আকাশ চিরে। আমার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। কতই বা বয়েস তখন? দশ কিম্বা বারো। আমি তোমার স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম মিঠুপিসি , ভয় পেয়েছিলাম। কতটুকু জানতাম তোমার বিষয়ে! আমি জানতাম তুমি সরলা দেবী গার্লস হাই স্কুলের অংকের দিদিমণি , তুমি ৫৫ , তোমার বিয়ে হয়নি, তুমি কারণে অকারণে খিটখিটে, তুমি হালকা রঙের শাড়িতে মানানসই, এইসব , এইসবই জানতাম তোমার বিষয়ে। সেই রাতে তোমার গোঙানিতে ঘুম  ভেঙ্গে গিয়েছিল। তুমি স্বপ্ন দেখছিলে মিঠুপিসি । তোমার ঘুমন্ত মুখে ছিল অদ্ভুত আলো। তোমার ঘুমন্ত মুখে ছিল শীৎকার ও শিহরন । তুমি অস্ফুটে বলছিলে ‘ আমারে ছাইড়ো না মিহির, আরো,আরো,আরো…। কে এই মিহির ? আমি আজো জানিনা মিঠুপিসি। তবে সেদিন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। হয়তো তখনি জেনে গিয়েছিলাম যে অই বয়সে যৌনতা আর তোমাকে মানায় না। না , এমনকি স্বপ্নেও না।

দিনকয়েক আগে ভোরের দিকে একটা স্বপ্ন দেখলাম । একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে , পিঠে ঘোড়সওয়ার। রাস্তাটা টুরিনের হলে খাপে খাপ হতো। কিন্তু রাস্তাটা মেদিনীপুরের। ঘোড়সওয়ারের হাতের চাবুক সপাং সপাং আছড়ে পড়ছে ঘোড়ার পিঠে। কোথা থেকে তুমি ছুটে এলে মিঠুপিসি, সটান দাঁড়িয়ে পড়লে ঘোড়া আর চাবুকের মাঝে। অথচ দেখো এই শটে তোমার থাকার কথা নয়। চিত্রনাট্য অনুযায়ী এই শটে নীৎসের থাকার কথা। তুমি ছুটে এসে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরলে মিঠুপিসি। এই দৃশ্য থেকেই ফেড আউট হয়ে সব মিলিয়ে যায়। পড়ে থাকে আদ্যিকালের টিভির ঝিরঝির। ঘোড়ার কী হয় বা  মিহিরের কী হয় , এসব কোনকিছুই আমার আর জানা হয়ে ওঠেনা। চিত্রনাট্য বলে যে নীৎসে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।  বাড়ির লোকেরা বলাবলি করে শেষের দিকে তোমার মাথাটাও গিয়েছিল মিঠুপিসি।

 ‘জোনাকি’ দ্য ফিল্ম

কিছু ছবি প্রি প্রোডাকশনের আগেই তৈরি হয়ে যায় ।  ৯০ মিনিট জোড়া ‘জোনাকি’র  প্রতিটি ইমেজ যেন সেই সাক্ষ্য বহন করে।অনুমান করা যায় , হ্যাঁ , করাই যায় ,যে  নরম কৈশোরে জীবন যখন ‘কমলালেবুর’ মতো স্বাস্থ্যবান ,প্রাণশক্তিতে ভরপুর  তখন নিজের অজান্তেই অনেক তুচ্ছ ঘটনা ও অনেক ছবি গভীর ছাপ ফেলে যায় সচেতনে ও অবচেতনে আর সেইসব ছবি ,সেইসব স্মৃতি জোনাকির মতো জ্বলতে নিভতে থাকে জীবনভর। সেইসব জ্বলতে নিভতে থাকার আলেখ্য হয়ে উঠতে চায় ‘জোনাকি’। ৬৭০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সেই অনুভূতিমালা  পুরোটাই ব্যক্তিগত। ধরা যাক এই স্বপ্নের ট্রেন সাড়ে আট নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়ে। আর সেই স্বপ্নের ট্রেনে তুমি  সফর সঙ্গী হতে পারলে তো ভালো , না পারলে পরিচালকের কোন দায় নেই।

অ্যালিস ইন দ্য ওয়ান্ডারল্যান্ড

“rule was very simple: No idea or image that might lend itself to a rational explanation of any kind would be accepted. We had to open all doors to the irrational and keep only those images that surprised us, without trying to explain why.” -Luis Bunuel

বাংলা মিডিয়ামের আমরা  কিশোরবেলায় ভাবতাম ‘আভা গার্দ’ বোধহয়  এমন কোন এক মেয়ের নাম যাকে ‘অঞ্জন দত্ত’ ভালবেসেছিলেন। পরে যখন জানলাম ও নামের কেউ নেই তখনো কিন্তু ভেঙ্গে পড়িনি। দত্তদের পুকুরপাড়ে রাত তিনটের সময় ফুঁপিয়ে কাঁদতো যে মৎসকন্যা সে যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি হয়ে রয়ে গিয়েছিল আভা গার্দ। আটপৌরে মলিন মধ্যবিত্ত জীবনে আমাদের খুঁজে পাওয়া ইরর‍্যাশানাল , ভিখিরির রক্তে বেজে ওঠা নাইন্থ সিম্ফনি , সাতটি তারার তিমিরে লুকিয়ে থাকা অলৌকিক নারী ও ভালোবাসা। ইতমধ্যে নবগ্রামে খুন হয়ে গেছে ‘টারজান’ , আমরা জেনেছি ১৪৪ ধারা , এমারঞ্জেন্সি, পেটো ,চীনের চেয়ারম্যান। এতো ভায়োলেন্সের ভিড়েও কিন্তু মাঝে মধ্যেই রাতের স্বপ্নে ফিরে এসেছে কিছু ইমেজ, কিছু ভালোবাসা আর বিশুদ্ধ এস্থেটিক্স।

ছবি – ইন্টারনেট

 

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami