চলচ্চিত্র

ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডেরস্ন্যাচঃ দর্শক-ই পরিচালক

লাবণ্য দে

ধরুন আপনি খাদের ধারে দাঁড়িয়ে দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখছেন, আপনার ঠিক পাশে একটি লোক এসে দাঁড়ালো। আপনি ভাবছেন লোকটির দিকে তাকাবেন কি তাকাবেন না, এমন সময় আপনার মনে হলো না তাকানোটাই বোধ হয় ভালো, অপরটা মনে হলে হয়তো আপনার বাকি সময়টা অন্যভাবে কাটতো। বা আপনার খাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, নয় আপনি নিজে ঝাঁপ দেবেন নয়তো লোকটাকে খাদের নীচে ঠেলে ফেলে দেবেন। তখন আপনি…
‘ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডেরস্ন্যাচ’ এভাবেই আমাদের মনকে চালনা করে,সিনেমার বিভিন্ন মুহুর্তে আমাদের ই নিয়ন্ত্রণ করতে দেয় গল্পের গতি। আমরা আর সিনেমার নীরব দর্শক থাকিনা, বরং আমরাও হয়ে উঠি সিনেমার পরিচালক, আমরাই বিভিন্ন মুহুর্তে ঘটনার অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করতে থাকি, সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত।

‘ইন্টার‍্যাকটিভ ফিল্ম’ বিষয়টা ফিল্মজঁরের ক্ষেত্রে এক নতুন উদ্ভাবন। যদিও ভিডিও গেমসের ক্ষেত্রে এই ইন্টার‍্যাক্ট বা আদানপ্রদান করার বিষয়টি অনেকদিন আগেই এসে গেছিলো।
‘ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডেরস্ন্যাচ’ এর প্রোটাগোনিস্ট স্টিফান ‘ব্যান্ডেরস্ন্যাচ’ নামে একটি ইন্টার‍্যাকটিভ ভিডিও গেম বানাতে চলেছে যেখানে ইউজারের বিভিন্ন অপশান নির্বাচন করার মাধ্যমে গেমটি এগোতে পারে বিভিন্ন পথ ধরে। স্টেফানের এই ভিডিও গেমের ধারণা স্টেফানের জীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। স্টেফান তাঁর জীবনের প্রতিটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে থমকে যেতে থাকে, তার মন ভাগ হয়ে যেতে থাকে দুভাগে। এবার স্টেফানের মনের এই দ্বিবিভাজন অপশান হিসেবে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় ডিজিটাল স্ক্রিনে, আমাদের অপশান নির্বাচন করা অনুযায়ী স্টেফানের জীবন চলতে থাকে। স্টেফান, যে কিনা পরিচালকের সৃষ্টি করা চরিত্র, সেই চরিত্র যতটাই পরিচালকের ততটাই আমাদের হয়ে ওঠে, আমাদের হাতেই পরিচালক দিয়ে দেন স্টেফানের জিয়নকাঠি- তা ছুঁয়ে দেওয়া বা তুলে নেওয়ায় গল্প এগোতে থাকে, স্টেফান সহ ঘটনাক্রম থেকে আমরা সমস্তকিছুই হয়ে ওঠে নিউরোটিক।

আমাদের ছবি দেখার অভ্যাসে থাকে একটি সুনির্দিষ্ট গল্প, তার সুনির্দিষ্ট শুরু, ক্লাইম্যাক্স ও যবনিকা পতন। ‘ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডেরস্ন্যাচ’ এই ছবি দেখার চিরাচরিত পদ্ধতিকেই প্রশ্ন করে, দুমড়ে মুচড়ে দেয় বাস্তবের ধারণা। বাস্তব বহুমুখী, আমার কাছে যা সত্য তা আরেকজনের কাছে মিথ্যে, আমার কাছে যা দিন, অন্ধের কাছে তা রাত। অর্থাৎ চিরসত্য বলে কিছু হয়না। এই ফিল্মটি তাই কোনো নির্দিষ্ট সমাপ্তিতে পৌঁছয় না, পৌঁছনোর চেষ্টাও করেনা, বরং সম্ভাব্য কিছু রাস্তা বাতলে দেয় মাত্র। শিল্পের কোনো একরৈখিক অর্থ হয় না, আমার কাছে কোনো কবিতা প্রেমের দ্যোতনা আনলে, একই কবিতা অপরের কাছে হয়ে উঠতে পারে বিচ্ছেদের। এই ছবিটি এই দর্শনকেই শরীরে ধারণ করে। আমরা দর্শকেরাই হয়ে উঠি ছবির নিয়ন্ত্রক, আমাদের ইচ্ছেতেই ছবির ঘটনাক্রম বইতে থাকে। তাই এই ছবির একাধিক শরীর, একাধিক ক্লাইম্যাক্স। শিল্পের অনুরণন যেমন বদলে বদলে যায় মানুষ থেকে মানুষে-তেমন ই এই ছবির নির্মান ভিন্ন ভিন্ন হতে থাকে প্রত্যেক ব্যক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণে।

ব্রেশট থিয়েটারে যা করতে চেয়েছিলেন, ‘ ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডেরস্ন্যাচ’ ফিল্মে তাই করেছে। কলাকুশলী বা গল্পের একাধিপত্য নয়- বরং দর্শক ও হয়ে উঠেছে গল্পের সক্রিয় অংশ। যে সিদ্ধান্ত মোড় ঘোরাতে পারে ঘটনার, তা দর্শকেই নেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে ছবিটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত। অবজেকটিভ দূরত্ব থেকে শিল্পকে দেখা নয়, বরং দর্শক নিজেই হয়ে উঠছে শিল্পের অংশ, শিল্পের নিয়ন্ত্রক, তার সাবজেক্টিভ পছন্দের ওপর নির্ভর করেই শিল্প এগিয়ে চলছে। শিল্প আর শুধুই শিল্পীর থাকছেনা, তা একইসাথে হয়ে উঠছে দর্শকের ও, দর্শক ও শিল্পীর আদানপ্রদানের মাধ্যমে যে দ্বান্দ্বিকতার জন্ম নিচ্ছে- তাই হয়ে উঠছে শিল্পের ভাষ্য। স্টেফান তার সাইকোলজিস্টের কাছে তার ছোটবেলার মায়ের স্মৃতি বলবে কি বলবে না, তা যেমন আমাদের হাতে থাকছে, তেমন ই বলা বা না বলার পর স্টেফান ও তার সাইকোলজিস্টের মধ্যে কি কথোপকথন হতে পারে তা হাতে থাকছে পরিচালকের। অর্থাৎ পরিচালক নিয়ন্ত্রণ করছেন আমাদের মনকে, আমরা নিয়ন্ত্রণ করছি স্টেফানের মনকে। স্টেফানের মনের দ্বৈতসত্ত্বা আমাদের মনের দ্বৈতসত্ত্বা হয়ে উপস্থিত হচ্ছে, আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত হয়ে উঠছে স্টেফানের নেওয়া সিদ্ধান্ত- সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালকের তৈরি করা ঘটনা দেখানো হচ্ছে আমাদের। অর্থাৎ পরিচালক যতটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছেন, আমরাও ততটাই পরিচালককে নিয়ন্ত্রণ করছি, উভয়ের এই পারস্পরিক আদানপ্রদানে ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে আধুনিক শিল্পের সম্ভাবনা।

স্টেফান একসময় বুঝতে পারে তার প্রতিটা ভাবনা, প্রতিটা  অ্যাকশান কোনোকিছুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সে জিজ্ঞেস করে কে নিয়ন্ত্রণ করছে তাকে, সেই মুহুর্তেই আবার আমাদের স্ক্রিনে দুটো অপশান আসে, স্টেফানকে কে নিয়ন্ত্রণ করছে তা বলে দেওয়ার জন্য। ফিল্মের স্টেফান বুঝতে পারে কেউ তাকে সবসময় দেখছে, কেউ সবসময় খেয়াল রাখছে তার কার্যকলাপ। আমরা স্টেফানকে দেখছি, আমরা আছি তাই স্টেফান আছে। স্টেফানকে তৈরি ই করা হয়েছে আমাদের জন্য। স্টেফানের মেধা, স্টেফানের উদ্ভাবনী শক্তি, স্টেফানের নিওরোসিস সব কিছুর অস্তিত্ব শুধু আমাদের দর্শকদের জন্যই- আমরা স্টেফানকে না দেখলে স্টেফানের কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার একইভাবে আমাদের অস্তিত্ব না থাকলে স্টেফানের নিওরোসিস নেই। আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের সার্ভেলিয়েন্স ই স্টেফানের নিওরোসিসের কারণ। আবার একই সার্ভেলিয়েন্সের আওতায় আমরাও। আমরা যে সার্ভার থেকে নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রাইব করে স্টেফানকে দেখছি, তা যেকোনো মুহুর্তেই ট্রেস করে ফেলা যায়, ট্রেস করে ফেলা যায় আমাদের প্রতিটা ব্যক্তিগত মুহুর্ত। আমরা যেমন স্টেফানের ওপর নজরদারি চালাচ্ছি, আমাদের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে রাষ্ট্র। জর্জ ওরওয়েল এর ‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং আস’ এর আওতায় আমরা সবাই। ‘ট্রু ম্যান শো’ এর ট্রুম্যানের মতো স্টেফান, আমি, আপনি প্রত্যেকে এই নজরদারিত্বের আওতায়। তাই স্টেফানের নিওরোসিস প্রতীকী মাত্র। এই নিওরোসিস আসলে আমার নিওরোসিস, আপনার নিওরোসিস, আমাদের জাতির নিওরোসিস যা বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ব সহ অপর কোনো বিশ্বেও।

শিল্প যখন জাতির নিউরোসিসকে ভাষায় পরিণত করে, শিল্প যখন প্রশ্ন করে তার নিজের অস্তিত্বকেই তখন সেই শিল্প সার্বজনীন হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে রাজনৈতিক। নেটফ্লিক্স অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া এই ফিল্মটি তার নিজের মাধ্যমকেই প্রশ্ন করতে থাকে। স্টেফানের নিওরোসিসের চালনা করছে নেটফ্লিক্স- এমন ভাষ্য ফিল্মটিতেই প্রকাশ পায়। স্টেফান বুঝতে পারেনা নেটফ্লিক্স ঠিক কি, তাকে বলা হয় এটি একটি বিনোদন মাধ্যম। অর্থাৎ নেটফ্লিক্স চালনা করছে স্টেফানকে, স্টেফানের নিওরোসিস বিক্রি হচ্ছে, স্টেফানের নিউরোসিস দিয়ে সূচিত হচ্ছে বিনোদন। যে নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রাইব করে আমরা স্টেফানের নিওরোসিস দেখতে বসি, যে নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রাইব করে বিনোদন কিনি আমরা, যে নেটফ্লিক্সে সবকিছুই পণ্য- সেই নেটফ্লিক্সে রিলিজ হওয়া ছবি তার নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে, প্রশ্নের মুখে ফেলে দর্শকের অবস্থানকেও। মূলধারার কাজ দেখতে গিয়ে এক ব্যতিক্রমী ধাক্কা লাগে, নিজেদের অস্তিস্ত্ব সংকটে পড়ে যায়, সঙ্কটে ফেলা হয় নেটফ্লিক্স নামক বিনোদন মাধ্যমটির অস্তিত্বকেও। মূলধারার মধ্যে অবস্থান করেও ছবিটির এই প্রতিস্পর্ধা স্তম্ভিত করে, শুধুমাত্র ভাবনার অভিনবত্বের মোহ থেকে সরে নড়েচড়ে বসি খানিকটা।

‘ব্ল্যাক মিরর’ এর অন্যান্য টিভি সিরিজগুলো প্রযুক্তির উন্নতি ইউটোপিয়ান দুনিয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে কিভাবে আদপে ডিস্টোপিয়ায় রূপান্তরিত হচ্ছে এই ভাবনার উপর নিয়ন্ত্রিত হয়। তাদের একটি নির্দিষ্ট গল্প- নির্দিষ্ট চলন থাকে। ‘ব্ল্যাক মিরর ব্যান্ডেরস্ন্যাচ’ তার ফর্মের দিক থেকে বৈপ্লবিক হয়ে ওঠে। ব্ল্যাক মিরররের অন্যান্য এপিসোড প্রযুক্তির নিওরোসিসকে একমাত্রিক বিষয়ের মধ্যে ধরে রাখে আর ব্যান্ডেরস্ন্যাচ এ প্রযুক্তির নিওরোসিস একইসাথে বিষয় ও ফর্মকে নির্ধারণ করতে থাকে। তার ফলে সেই নিওরোসিস শুধুমাত্রই ছবির পর্দার নিওরোসিসে আবদ্ধ থাকেনা, বরং শিল্পের এই নিওরোসিস হয়ে ওঠে রাজনৈতিক- যা আমাদের সকলের ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত, জাতিগত নিওরোসিস।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami